বাংলা দেখা না গেলে

রেজি নং-ডিএ-৯১১, ঢাকা ১৮ জানুয়ারী ২০২০, শনিবার। অনলাইন সংখ্যা: ১৬৩৮

সুদহার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কার্যকর জরুরি: রূপালী ব্যাংকের এমডি

সুদহার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কার্যকর জরুরি: রূপালী ব্যাংকের এমডি

১৪ জানুয়ারী ২০২০, ১৩:২০, মঙ্গলবার ।

পথযাত্রা রিপোর্ট ।।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেছেন, ব্যাংক ঋণে সুদের হার ৯ এবং আমানতে ৬ শতাংশ (সিঙ্গেল ডিজিট) কার্যকরের বিষয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলছে।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও চাচ্ছেন ঋণের সুদ এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে অর্থাৎ এই হার হবে ৯ শতাংশ। যে কোনো বড় কাজ বা শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চাইলে মানুষ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়। ব্যাংক কিন্তু বিনা সুদে ঋণ দেয় না। আর সুদের হার যত বেশি, পণ্য উৎপাদনে খরচও তত বৃদ্ধি পায়।

এখন যদি ঋণের সুদ কমিয়ে আনা যায়, তাহলে উদ্যোক্তা-ভোক্তা উভয়ই লাভবান হবেন। একই সঙ্গে দেশে শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। বাড়াবে খাদ্য উৎপাদন।  সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘বিশ্বের প্রায় সব দেশে ব্যাংক ঋণে সুদের হার কম। এ দেশেও যেন উচ্চসুদের হার উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে কারণে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী চেয়েছেন সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে।

তবে দেড় বছর আগে যখন সুদহার কমানোর প্রথম ঘোষণা আসে, তখন থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংক এই হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে এনেছে। এর মধ্যে সবার আগে সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন করে রূপালী ব্যাংক। সরকারি ব্যাংকের কয়েকটি দুর্বলতা ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আর্থিক ভিত্তি অনেক মজবুত।

ব্যাংকগুলোর বয়সও অনেক বেশি। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রশাসনিক ব্যয় এবং ‘কস্ট অব ফান্ড’ অনেক কম। সে কারণে এসব ব্যাংক সহজেই সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। এটি অন্যান্য ব্যাংকেরও বাস্তবায়ন করা উচিত। তবে একেক ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড একেক রকম।

এতে ব্যাংকগুলো কিছুটা চাপে পড়বে। সেক্ষেত্রে বিকল্প পদ্ধতিতে চাপ সামাল দেয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের। কিন্তু মূল যে স্রোতধারা, অর্থাৎ সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নে সব ব্যাংককে অংশগ্রহণ করতেই হবে।

যদি নিজেদের দেশের উন্নয়নের অংশীদার মনে করি, তাহলে রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূলধারার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে অর্থাৎ সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।’

২০১৯ সালের আগস্টে ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে রূপালী ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এর আগে তিনি দেশের সর্ববৃহৎ সোনালী ব্যাংকের এমডি ছিলেন।

তার মেয়াদে ৫০০ কোটি টাকার লোকসানে থাকা সোনালী ব্যাংককে ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার লাভে এনেছেন। খেলাপিসহ বিভিন্ন পাওনাদারদের থেকে আদায় করেছেন ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। যার সুফল বর্তমানে সোনালী ব্যাংক পাচ্ছে।

চলতি বছরের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। দিবসটি উদযাপনে ব্যাংকিং খাতে নানা আয়োজন রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ‘মুজিববর্ষে শুভদিন শূন্য সুদে কৃষিঋণ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিনা সুদে কৃষিঋণ বিতরণ শুরু করেছে রূপালী ব্যাংক।

১ জানুয়ারি থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে টমেটো চাষীদের মধ্যে ‘জিরো কুপন লেন্ডিং’ কর্মসূচির আওতায় এই ঋণ বিতরণ শুরু করে ব্যাংকটি। পাইলট প্রকল্প হিসেবে নাটোরের ৫০০ টমেটো চাষীকে ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা করে ঋণ দেয়া হবে।

এর জন্য ব্যাংক বরাদ্দ রেখেছে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৯-২০ অর্থবছরের কৃষিঋণ নীতিমালা অনুযায়ী, এই পরিমাণ ঋণ দিয়ে কৃষক ১ দশমিক ২৯ একর জমিতে টমেটো চাষ করতে পারবেন।

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘প্রাথমিক প্রকল্প হিসেবে টমেটো চাষীদের ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে সারা দেশের সব শাখার মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষিপণ্যের চাষীদের মাঝে বিনা সুদে ঋণ বিতরণ করা হবে। আদা, হলুদ, পেঁয়াজ, আম চাষে বিনা সুদে ঋণ বিতরণ করা হবে। এছাড়া উন্নত দেশ থেকে গরু আমদানিতে ঋণ দেয়ার কথাও ভাবছে ব্যাংকটি।’

বিনা সুদে ঋণ প্রকল্পের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটি ঋণের মেয়াদ থাকবে ছয় মাস। গ্রীষ্মকালীন টমেটো ও রবি টমেটো চাষের জন্য বছরে দুইবার ঋণ বিতরণ করবে রূপালী ব্যাংক। রবি চাষের জন্য ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর এবং গ্রীষ্মকালীন চাষের জন্য ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত এই ঋণ বিতরণ করা হবে।

রবি চাষের জন্য নেয়া ঋণ পরিশোধ করতে হবে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে এবং গ্রীষ্মকালীনের জন্য নেয়া ঋণ পরিশোধ করতে হবে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে। এই ঋণ নিতে কোনো জামানত লাগবে না। তবে স্বামী বা স্ত্রী অথবা গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তি ঋণের জামিনদার হিসেবে থাকবেন।

১০ টাকার কৃষক হিসাবের মাধ্যমেই ঋণ উত্তোলন ও পরিশোধ করতে হবে। উৎপাদিত টমেটো বিক্রির অর্থের মাধ্যমে দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ঋণ বিতরণকারী শাখা কৃষকের ১০ টাকার হিসাব থেকে ঋণের টাকা আদায় করতে পারবে।

ঋণ বিতরণকারী শাখা, জোনাল অফিসের প্রতিনিধি ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত টিম চারা রোপণ থেকে শুরু করে ঋণ আদায় পর্যন্ত তদারকি করবেন।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘প্রান্তিক চাষী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দামের যে বড় ব্যবধান, এখানে সুদেরও একটা ভূমিকা আছে। এখন যদি কৃষককে বিনা সুদে ঋণ দেই তাহলে তারা সাবলম্বী হয়ে উঠবে। জামালপুরে দেখেছি কৃষক দুই টাকা কেজি দরে টমেটো বিক্রি করছে।

অথচ ক্রেতা সেই টমেটো কিনছে ১০০ টাকা কেজিতে। এজন্যই কৃষকদের মাঝে বিনা সুদে ঋণ বিতরণ করে একদিকে তাদেরকে দাদনদার, মধ্যস্বত্বভোগী ও পরিবহন খরচের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি, অন্যদিকে কৃষক ও ভোক্তার জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাচ্ছি।

এছাড়া মুজিব বর্ষে ১০০টি শাখা, ১০০টি উপশাখা ও ১০০টি এটিএম বুথ স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের ১০০টি বাড়ি নির্মাণ করে দেয়া হবে। বিধবা পল্লীতে বাড়ি করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আর রূপালী ব্যাংক তাদের সঞ্চয়পত্র দেয়ার কথা ভাবছে।’

খেলাপি ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপির ৮০ ভাগ মন্দ ঋণ ১০টি শাখায় আটকে আছে। এগুলোকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় আইসিইউ পর্যায়ে নিয়ে নিবিড় পরিচর্যা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

সূত্র জানায়, লাল-সবুজের রূপালী ব্যাংক শতভাগ অনলাইনের আওতায়। এতে রয়েছে এক কোটি পঁচাত্তর লাখ মায়ের ব্যাংক হিসাব। যার মাধ্যমে সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন মায়েরা। এর মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা প্রদান করে সরকার।

এতে সরকারের বই ছাপানো বাবদ ২০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়। ব্যাংকটি ঋণের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন শূন্য ও সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ নিয়ে থাকে। ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের মেয়াদের প্রথম চার মাসেই রেমিটেন্স ৩১ শতাংশ এবং ডিপোজিট বেড়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা।

এছাড়া সরকার প্রদত্ত প্রণোদনাসহ রেমিটেন্স বৃদ্ধিতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের আমানত ৪১ হাজার কোটি এবং ঋণ রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটি একসময় শতকোটি টাকার বেশি লোকসানে ছিল, গত কয়েক বছর ধরে লাভে এসেছে। সর্বশেষ বিদায়ী বছরেও প্রায় ৩০০ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে রূপালী ব্যাংক।

***পথযাত্রায় প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বশেষ সংবাদ

অর্থনীতি এর সব খবর >>